মোবাইল ফোনে বিয়ে, এরপর আড়াই বছর ধরে সংসার শুরুর অপেক্ষা। দীর্ঘ সেই অপেক্ষার অবসান ঘটলো ঠিকই, কিন্তু স্বামীকে নিয়ে ঘর বাঁধার স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
সৌদি আরবের রিয়াদে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারিয়েছেন নাটোরের প্রবাসী সাব্বির হোসেন শুভ (৩০)। সংসার শুরুর আগেই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে সাব্বিরের স্ত্রীকে নিয়ে সুখের সংসার গড়ার স্বপ্ন। এখন শ্বশুরবাড়িতে নববধূর দিন কাটছে স্বামীর লাশের অপেক্ষায়।
নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার খাজুরাশ্রীপুর পাড়ায় সৌদি আরবের রিয়াদে অগ্নিকাণ্ডে নিহত সাব্বির হোসেন শুভর (৩০) বাড়িতে এখন কেবল স্বজনদের কান্না আর আহাজারি। স্বামীর মৃত্যুর খবর পেয়ে শ্বশুরবাড়িতে ছুটে এসেছেন সাব্বিরের স্ত্রী। অথচ বিয়ের পর আড়াই বছরেও স্বামীর সঙ্গে সরাসরি দেখা হয়নি তার।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, পরিবারের ঋণের বোঝা কাঁধে নিয়ে সাড়ে চার বছর আগে সৌদি আরবে পাড়ি জমান গোলাম রাব্বানী ও সাবিনা বেগম দম্পতির একমাত্র ছেলে সাব্বির। প্রবাসে কষ্টার্জিত অর্থে ধীরে ধীরে পরিবারের ঋণ পরিশোধের পাশাপাশি ঘরের অসমাপ্ত কাজও এগিয়ে নিচ্ছিলেন তিনি। এরই মধ্যে আড়াই বছর আগে পারিবারিকভাবে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার এক তরুণীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়।
বিয়ের পর একবারের জন্যও সরাসরি দেখা হয়নি তাদের। ভিডিও কল আর মোবাইল ফোনের কথোপকথনই ছিল তাদের দাম্পত্য জীবনের একমাত্র অবলম্বন। স্বপ্ন ছিল সাব্বির একদিন দেশে ফিরে স্ত্রীকে ঘরে তুলে শুরু করবেন তাদের স্বপ্নের সংসার। সাব্বিরের সেই স্বপ্ন পূরণের কথা ছিল আগামী রোজার ঈদে। দেশে ফিরে ছোট বোনের ধুমধাম করে বিয়ে দেবেন, এরপর আনুষ্ঠানিকভাবে স্ত্রীকে ঘরে তুলে সংসার শুরু করবেন। সেই দিনের অপেক্ষায় ছিলেন পরিবারের সদস্যরাও।
কিন্তু এক নিমেষেই সব স্বপ্ন ছাই করে দিয়েছে রিয়াদের আগুন। গত রোববার (৯ আগস্ট) সৌদি আরবের রিয়াদের মানফুয়া এলাকায় একটি সোফা তৈরির কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে সাব্বিরসহ ১৬ জন শ্রমিকের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার শামীম আহমেদ ও রবিউল ইসলাম নামে আরও দুজন যুবক রয়েছেন।
সাব্বিরের চাচাতো বোন সেলিনা খাতুন বলেন, ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে ভাবি বাড়িতে এসেছে। কিন্তু তখন আমার ভাই আর জীবিত নেই। ভাই আর ভাবিকে একসঙ্গে জীবিত দেখতে পারলাম না।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সাব্বিরের উপার্জনে ধীরে ধীরে ঋণের বোঝা কমছিল। বাড়ির অসমাপ্ত কাজও এগিয়ে চলছিল। ঘরের কাজ শেষ না করে দেশে ফিরতে চাইতেন না তিনি। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে প্রবাসে যাওয়া সেই ছেলেটিই এখন লাশ হয়ে দেশে ফেরার অপেক্ষায়।
সাব্বিরের বাবা গোলাম রাব্বানী বলেন, ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। সে কিছু টাকা পরিশোধও করেছে। এখনো কয়েক লাখ টাকা ঋণ রয়েছে। ঋণ পরিশোধ করে ঘরের কাজ শেষ করার কথা ছিল। ঘর ঠিক না করে ছেলে বাড়িতে আসতে চাইত না। সরকারের কাছে দাবি, দ্রুত আমার সন্তানের লাশ আমাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হোক।
নলডাঙ্গা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আল ইমরান খান জানান, ঘটনাটি জানার পরই জেলা প্রশাসনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিষয়টি অবগত করা হয়েছে। নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করে সমবেদনা জানানো হয়েছে। নিহত পরিবারের কোনো সহযোগিতার প্রয়োজন হলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তা করা হবে। মরদেহগুলো পরিবারের কাছে পৌঁছে দিতে সরকার কাছ শুরু করেছে।

মন্তব্য করুন
মন্তব্য সমূহ
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!