চোরা শিকার, অপরিকল্পিত নগরায়ন, বন উজাড় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাবে বাংলাদেশ থেকে গত কয়েকশ বছরে ৩১ প্রজাতির বন্যপ্রাণী চিরতরে হারিয়ে গেছে। বিলুপ্ত হওয়া এই প্রজাতির মধ্যে রয়েছে ১১টি স্তন্যপায়ী, ১৯টি পাখি এবং ১টি সরীসৃপ। দেশের এই ক্রমবর্ধমান বন্যপ্রাণী সংকটের সামগ্রিক অবস্থা নতুন করে মূল্যায়নে চলতি বছর (২০২৬ সালে) রেড লিস্ট হালনাগাদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছে সরকার। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম আরও জোরদার করতে গঠন করা হয়েছে নতুন বন্যপ্রাণী কমিশন।
রোববার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তর পর্বে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু এসব তথ্য জানান। সংসদ অধিবেশনে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ সভাপতিত্ব করেন এবং মন্ত্রীর এই উত্তর প্রশ্নোত্তর টেবিলে উপস্থাপন করা হয়।
মন্ত্রী আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘের (আইইউসিএন) ২০১৫ সালের জরিপের তথ্য তুলে ধরে জানান, বন্যপ্রাণীর প্রধান আবাসস্থল বনভূমি সংকুচিত হওয়ায় এবং নানা মানবসৃষ্ট সংকটের কারণে বিশ্বব্যাপী জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে রয়েছে। আইইউসিএন-এর ‘রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ-২০১৫’ অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ১ হাজার ৬১৯ প্রজাতির বন্যপ্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে ৪৯ প্রজাতির উভচর, ১৬৭ প্রজাতির সরীসৃপ, ৫৬৬ প্রজাতির পাখি, ১৩৮ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ২৫৩ প্রজাতির মিঠাপানির মাছ, ১৪১ প্রজাতির ক্রাস্টেশিয়ান ও ৩০৫ প্রজাতির প্রজাপতি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ২০১৫ সালের পর দীর্ঘ বিরতি পেরিয়ে ২০২৬ সালে এই রেড লিস্ট হালনাগাদের কাজ শুরু হওয়ায় বর্তমানে কোন কোন প্রজাতি কী মাত্রায় হুমকির মুখে রয়েছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ও নতুন তথ্য মিলবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের কথা তুলে ধরে পরিবেশমন্ত্রী জানান, বন অধিদপ্তরের আওতাধীন বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট অবৈধ পাচার রোধ ও অপরাধ দমনে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। বিশেষ করে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধিতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ সুফল দিচ্ছে। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশে ২০১৫ সালে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি, যা ২০১৮ সালে বেড়ে ১১৪টি এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালে ১১২৫টিতে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, ২০১৫ সালের তুলনায় বাঘের সংখ্যা ১৭ দশমিক ৯২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। সুন্দরবনে বাঘ ও হরিণ শিকার প্রতিরোধে ১০০টি সচেতনতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, স্কুল শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্তকরণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করায় এই ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
এছাড়াও, এশীয় হাতি সংরক্ষণে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদি ‘হাতি সংরক্ষণ প্রকল্প’ বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। মহাবিপন্ন শকুন সংরক্ষণে সুন্দরবন ও সিলেট অঞ্চলে ৪৭ হাজার ৩৮০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে দুটি শকুন নিরাপদ এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কার্যক্রমকে আরও গতিশীল এবং মাঠপর্যায়ে কার্যক্রম বিস্তৃত করতে শেরপুর, কক্সবাজার, রাঙামাটি ও রাজশাহীতে চারটি নতুন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সৃষ্টির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে বলেও সংসদকে জানান মন্ত্রী।

মন্তব্য করুন
মন্তব্য সমূহ
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্য করুন!