গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ ও নির্বিচারে বাস্তুচ্যুতির ভয়াবহতার মধ্যে এবার মৃতদের দাফনের জায়গার তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ইসরাইলি হামলায় হাজারো মানুষের মৃত্যুর পাশাপাশি ধ্বংস হয়েছে বহু কবরস্থান। এর ফলে নিহত স্বজনদের দাফন করতে গিয়ে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোকে পুরোনো কবর পুনর্ব্যবহার, অস্থায়ী কবর তৈরি কিংবা ধ্বংসস্তূপের জায়গায় লাশ সমাহিত করার মতো অমানবিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

গাজায় একটি নতুন কবর তৈরি করতে আগে খরচ কম হলেও বর্তমানে তা বেড়ে ৭০০ থেকে ১ হাজার শেকেল বা প্রায় ২৩৫ থেকে ৩৩৫ ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্রয়োজনীয় নির্মাণসামগ্রী ও কবরের ফলকের সংকটে এই ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে। স্থায়ী ফলক তৈরি করতে না পেরে অনেকে ধ্বংস হওয়া ভবনের ইট-পাথর, কাদা কিংবা ঢেউটিন দিয়ে অস্থায়ীভাবে কবর চিহ্নিত করছেন।
গাজার ধর্মীয় ও ওয়াক্ফ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অঞ্চলটির ৪০টির বেশি কবরস্থান ধ্বংস করা হয়েছে। ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় কবরস্থানে প্রবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ থাকায় দাফনের সুযোগ আরও সীমিত হয়ে পড়েছে। এছাড়া লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে আশ্রয় নেওয়ায় আগেকার অনেক কবরস্থান এখন বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবু বা শিবিরে পরিণত হয়েছে।
খান ইউনিস কবরস্থানের কর্মী তাফেশ যুদ্ধের ভয়াবহতার এক মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরেছেন। যুদ্ধ শুরুর আগে ওই কবরস্থানে মাত্র ৬০টি কবর ছিল, যা বেড়ে এখন প্রায় ৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার একপর্যায়ে তাকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩৫টি নতুন কবর প্রস্তুত করতে হয়েছে।

জেইতুন এলাকার ২০ বছর বয়সি ওমর আল-সাওহি জানান, গত ১০ জুন তার ৪০ বছর বয়সি বাবা মোহাম্মদ আল-সাওহি একটি রাস্তার পাশে চা-কফি বিক্রির সময় ইসরাইলি গুলিতে নিহত হন। বাবাকে দাফন করতে জেইতুন কবরস্থানে গিয়ে ওমর দেখেন, সেখানে তিল ধারণের জায়গাও নেই। পরিবারের আর্থিক অস্বচ্ছলতা এবং নতুন জায়গার অভাবে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে বাবাকে তার দাদার কবরেই দাফন করতে হয় তিনি।

হাসপাতাল প্রাঙ্গণ, স্কুল, বাস্তুচ্যুতদের শিবির কিংবা বাড়ির আঙিনায় বহু লাশ অস্থায়ীভাবে দাফন করা হয়েছিল। যুদ্ধবিরতি ও সাময়িক বিরতির সুযোগে অনেক পরিবার ধ্বংসস্তূপ থেকে স্বজনদের অবশেষ উদ্ধার করে পুনরায় দাফনের উদ্যোগ নিচ্ছে। গাজার কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও অন্তত ১ হাজার ২০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এছাড়া হাসপাতালগুলোর প্রাঙ্গণে থাকা সাতটি গণকবর থেকেও ৫২৯ ফিলিস্তিনির লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

নিহতদের একটি বড় অংশই নারী, শিশু ও নবজাতক। ইসরাইলি হামলায় আস্ত পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর একই পরিবারের একাধিক সদস্যের লাশ একসঙ্গে কবরস্থানে নিয়ে আসার ঘটনাও নিয়মিত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তাফেশের ভাষায়, "তারা আমাদের মাথার ওপর ঘরবাড়ি ধ্বংস করে, আর সেই ঘরের ধ্বংসস্তূপ থেকেই আমরা আমাদের কবর তৈরি করি।"

গাজায় যুদ্ধের ভয়াবহতা আজ কেবল জীবিতদের বাস্তুচ্যুতি ও ধ্বংসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; প্রিয়জনদের শেষ আশ্রয়—একটি সম্মানের কবর—পাওয়াও আজ সেখানকার মানুষের জন্য এক কঠিন ও অসম সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।

সূত্র: আল-জাজিরা