নীলফামারী সদর উপজেলা প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রায় ৩০ জন সহকারী শিক্ষককে নিয়মবহির্ভূতভাবে ডেপুটেশনে (প্রেষণ) সংযুক্ত করার অভিযোগ উঠেছে শিক্ষা কর্মকর্তা জছিজুল আলম মন্ডলের বিরুদ্ধে। মেয়াদ শেষ হলেও নিজ বিদ্যালয়ে না ফেরার কারণে শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান।
জানা যায়, শহরের জানকীনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তাহেরা বিলকিস বানু ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর চিকিৎসাজনিত ছুটিতে যান। পরে তার যায়গায় চাপড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সুমি আক্তারকে ডেপুটেশনে সংযুক্ত করা হয়। ডেপুটেশনে উল্লেখ করা হয় বিলকিস বানুর চিকিৎসাজনিত ছুটি শেষে জানকীনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করলেই সংযুক্ত আদেশ বাতিল বলে গন্য হবে। তবে ২০২৫ সালের ৫ এপ্রিল তাহেরা বিলকিস বানু কর্মস্থলে যোগদান করলেও সংযুক্ত শর্ত ভঙ্গ করে নিজ বিদ্যালয়ে যোগদান করেননি সুমি আক্তার। তিনি এখনো জানকীনাথ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েই নিয়মিত পাঠদান করাচ্ছেন। ফলে তার নিজ বিদ্যালয় চাপড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকটে ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান।
চলতি বছরের গত ৯ জুলাই প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সহকারী পরিচালক (পলিসি ও অপারেশন) মাহফুজা খাতুন সাক্ষরিত এক নোটিশে বলা হয়, সেসব প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নির্ধারিত সময়হীন শিক্ষকদের ডেপুটেশন সংযুক্ত দেওয়া হয়েছে তা যোগদানের এক বছর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা এক বছর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা তাদের অবমুক্ত করবেন এবং তারা নিজ বিদ্যালয়ে যোগদান করবেন। তবে নির্দেশনা অমান্য করে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা প্রায় ৩০ জন সহকারী শিক্ষককে কয়েক বছর ধরে তাদের সুবিধাজনক বিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে সংযুক্ত রেখেছেন।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, ছিট চাপড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা মাসুমা আখতার তিন বছর ধরে কুখাপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ডেপুটেশন সংযুক্ত আছেন। মুশরুত গোড়গ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা শাহানাজ পারভীন দুই বছর ধরে বড়াইবাড়ি আদর্শপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে সংযুক্ত আছেন। দক্ষিণ খোজসাবাড়ি আব্দুল জব্বার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা কাকলি রায় তিন বছরের বেশি সময় ধরে খোকসাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে আছেন। পঞ্চপুকুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা সবুজা বেগম সাথী প্রায় চার বছর ধরে উত্তর কানিয়ালখাতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ডেপুটেশনে সংযুক্ত আছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রায় ৩০ জন সহকারী শিক্ষক নিজ বিদ্যালয় ছেড়ে সুবিধাজনক অন্য বিদ্যালয়ে ডেপুটেশন সংযুক্ত রয়েছেন।
আরও দেখা যায়, নিজ বিদ্যালয় ছেড়ে সুবিধাজনক বিদ্যালয়ে ডেপুটেশন সংযুক্ত থাকার কারণে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। এক শিক্ষকের সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত টানা পাঠদান করাতে হচ্ছে। শিক্ষক সংকটের কারণে বিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশে পাঠদান করাতে পারছেন না। কোথাও কোথাও এক শিক্ষকই একসঙ্গে দুটি শ্রেণির পাঠদান করাচ্ছেন।
প্রধান শিক্ষকদের অভিযোগ, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জছিজুল আলম মন্ডল আর্থিক সুবিধা নিয়ে নিয়ম বহির্ভূতভাবে সহকারী শিক্ষকদের সুবিধাজনক স্থানে ডেপুটেশন সংযুক্ত করেন। জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যলয় থেকে ডেপুটেশন আদেশ না দিলেও কখনো কখনো তিনি ভুয়া কাগজ বানিয়ে শিক্ষকদের ডেপুটেশনে সংযুক্ত করেন। এ ব্যাপারে কোনো প্রধান শিক্ষক প্রতিবাদ জানালে হয়রানি করা হয় তাদের। নিজ বিদ্যালয় ছেড়ে অন্য বিদ্যালয়ে যাওয়া শিক্ষকদের নিজ বিদ্যালয়ে ফেরত আনতে বার বার আবেদন করলেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না তিনি।
চাপড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাসুদা বেগম বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ে সুমি আক্তার ২০১৭ সালে যোগদান করেন। পরে ২০২৪ সালের দিকে বিদ্যালয় থেকে তিনি ডেপুটেশনে চলে যান। তিনি চলে যাওয়ার পরে আমাদের বেশি ক্লাস নিতে হচ্ছে। শিক্ষকদের নির্ধারিত ক্লাসের বাইরে আমরা অতিরিক্ত ক্লাস নিচ্ছি, অনেক সময়ই পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। তিনি নিজ বিদ্যালয়ে ফিরলে আমাদের সুবিধা হবে। আমি গত বছরে তাকে নিজ বিদ্যালয়ে ফেরাতে সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তার পরামর্শে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা বরাবর লিখিত আবেদন করেছিলাম। লিখিত আবেদন দেওয়ার দীর্ঘদিন হলেও কোনো কাজ হয়নি।
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক আরেক প্রধান শিক্ষক বলেন, প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আর্থিক সুবিধা নিয়ে এসব শিক্ষককে নিজের সুবিধামতো জায়গায় রেখেছেন। মন্ত্রণালয়ের আদেশ অনুযায়ী তাদের নিজ বিদ্যালয়ে ফেরার কথা থাকলেও তাদের ফেরানো হয়নি। এ বিষয়ে কোনো প্রধান শিক্ষক কথা বললেই তাকে হয়রানি করা হবে। আমরা কেউ এ বিষয়ে কিছু বলতে পারি না। এভাবে বিদ্যালয়গুলো চলার কারণে আমরা বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। ছিট চাপড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র তিনজন শিক্ষক আছেন, শিক্ষক সংকটের কারণে এনারা কেউ ছুটিও নিতে পারেন না।
এ বিষয়ে সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জছিজুল আলম মন্ডল বলেন, কোথায় কোথায় ডেপুটেশনে আছেন বিষয়টি দেখছি। তা ছাড়া কেউ যদি অভিযোগ করে আর্থিক সুবিধা নেওয়া হয়েছে সেটি মিথ্যা।
নীলফামারী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা (ভারপ্রাপ্ত) রবিউল ইসলাম বলেন, বিষয়টি জানালেন, আমি খতিয়ে দেখছি। এমন হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, সরকারি প্রজ্ঞাপনে ২০১১ সালে রংপুর জেলার কাউনিয়া উপজেলায় জছিজুল আলম মন্ডল সহকারী উপজেলা কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় কর্মচারীদের সঙ্গে অসৎ আচরণ ও দুর্নীতির অভিযোগে লঘুদণ্ড প্রদান করা হয়েছিল।