এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে তীব্র পানিসংকট ও নদীর ব্যবস্থাপনার অবনতির কারণে পুরো অঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে বলে সতর্ক করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটির মতে, এ অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় খাদ্য ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা, পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং সার্বিক স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে নদী অববাহিকাভিত্তিক টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার এখনই উপযুক্ত সময়।
মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) সকালে এডিবির ঢাকা অফিস থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
এডিবি জানায়, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলটি বিশ্ব জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি মানুষের আবাসস্থল হলেও এখানে বিশ্বমানের তুলনায় অত্যন্ত সীমিত পরিমাণে নির্মল পানি রয়েছে। বৈশ্বিক মোট চাষযোগ্য জমির মাত্র ৩০ শতাংশ এবং পানির মাত্র ২৮ শতাংশ ব্যবহার করে এ বিশাল অঞ্চলের প্রায় ৪ বিলিয়নেরও বেশি মানুষকে আহার জোগাতে হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এ অঞ্চলের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জমিই এখন তীব্র পানিসংকটের মুখোমুখি। এর ওপর সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত প্রধান খাদ্যশস্য ধান চাষেই ব্যবহৃত হচ্ছে সেচের সিংহভাগ পানি। অতিরিক্ত সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে একদিকে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে আশঙ্কাজনক হারে উর্বরতা হারাচ্ছে কৃষিজমি।
এর সঙ্গে নতুন মাত্রা যোগ করেছে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব। হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো আশঙ্কাজনক হারে গলতে শুরু করেছে, যা প্রায় ২০০ কোটি মানুষের পানির মূল উৎস। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, চলতি শতাব্দীতেই এ হিমবাহের এক-তৃতীয়াংশ বিলীন হয়ে যেতে পারে। এর ফলে প্রাথমিক অবস্থায় নদীতে প্রবাহ বাড়লেও দীর্ঘমেয়াদে শুষ্ক মৌসুমে দেখা দেবে পানির তীব্র সংকট। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, আকস্মিক বন্যা এবং খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ইতোমধ্যেই পাকিস্তানের নদী অববাহিকা থেকে শুরু করে ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কৃষি অর্থনীতিকে ব্যাপক ক্ষতির মুখে ফেলেছে।
সংস্থাটি জানায়, কৃষির আধুনিকায়ন ও গত কয়েক দশকের বিপ্লব এ অঞ্চলে ক্ষুধা হয়তো কিছুটা কমিয়েছে, তবে পরিবেশের ওপর রেখে গেছে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত। অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে দক্ষিণ এশিয়ার পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। নদীর পানি দূষিত হয়ে সমুদ্রের উপকূলীয় অঞ্চলে তৈরি হচ্ছে মাছহীন 'ডেড জোন'। আবার ক্যালরিভিত্তিক খাদ্য উৎপাদনে নজর দেওয়ায় জনগণের পুষ্টির চাহিদাও ঠিকমতো পূরণ হচ্ছে না। নোংরা ও দূষিত পানির কারণে বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ছে, যা শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও পুষ্টি শোষণে চরম বাধা সৃষ্টি করছে।
এ সংকটময় চক্র ভাঙতে হলে নদী ও অববাহিকাভিত্তিক সামগ্রিক পানি ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই। নদীর সুরক্ষায় একটি নির্দিষ্ট সীমানায় সীমাবদ্ধ না থেকে হিমালয়ের পাহাড়ি এলাকা থেকে শুরু করে সমুদ্রের বদ্বীপ পর্যন্ত সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে হবে। উজানের বনাঞ্চল রক্ষা করা গেলে ভাটির অঞ্চলের বন্যা কমে এবং সেচব্যবস্থা সচল থাকবে। এর পাশাপাশি পানিকে একটি প্রাকৃতিক মূলধন হিসেবে বিবেচনা করে পরিকল্পনা সাজাতে হবে, যাতে প্রাকৃতিক দুর্যোগের আর্থিক ধাক্কা থেকে কৃষি ও শিল্প খাতকে রক্ষা করা সম্ভব হয়।
সমাধানের রূপরেখা ও সুপারিশ: এডিবি আরও জানায়, খাদ্য ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হলে সর্বোচ্চ ফলন বাড়ানোর নীতি থেকে সরে এসে সামগ্রিক পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে। যেমন ড্রিপ ইরিগেশন বা বিন্দুকালীন সেচ পদ্ধতি ব্যবহার করলে পানির অপচয় প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে শুধুমাত্র ধান চাষের ওপর নির্ভরশীল না থেকে উদ্যানপালন ও বৈচিত্র্যময় ফসল উৎপাদনের দিকে নজর দিলে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমবে। এ কাজে পানি, কৃষি, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মতো সরকারি বিভাগগুলোর বিচ্ছিন্নভাবে কাজ না করে যৌথ নীতিমালার অধীনে আসা প্রয়োজন।
এছাড়া স্বল্পমেয়াদি উদ্যোগের বদলে দীর্ঘমেয়াদি সেচ আধুনিকীকরণ, ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে পানি পর্যবেক্ষণ এবং জলবায়ু অভিযোজনমূলক বিনিয়োগই টেকসই স্থিতিশীলতা আনতে পারে। একই সঙ্গে দেশের কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করাও অন্যতম প্রধান শর্ত। গবেষণায় দেখা গেছে, পানির ব্যবস্থাপনা ও ব্যবহারে নারীরা সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পেলে সেচ ব্যবস্থার সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত হয় এবং এর কর্মপরিধি সম্প্রসারিত হয়। নদীর স্বাস্থ্য রক্ষা করা কেবল পরিবেশের বিষয় নয়, এটি সমগ্র এশিয়ার ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির মূল চাবিকাঠি।