পটুয়াখালীর সদর উপজেলায় শাশুড়ি ও মেয়ে জামাইয়ের অবৈধ সম্পর্ক দেখে ফেলায় স্বর্ণা আক্তার (১৯) নামে এক গৃহবধূকে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় অভিযুক্ত শাশুড়ি মুনজুমা বেগম (৪০) ও ননদ জামাই সৌরভসহ (৩০) শ্বশুরবাড়ির পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ এনে থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুলিশ ঘটনার পর স্বর্ণার স্বামী রাকিবকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে।

শনিবার (১৩ জুন) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে পটুয়াখালী সদর উপজেলার বড়বিঘাই ইউনিয়নের সি-কেওয়াবুনিয়া বাজারে এক বিশাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন নিহত গৃহবধূর পরিবার ও স্থানীয় এলাকাবাসী।

মানববন্ধনে বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শাশুড়ি মুনজুমার মেয়ে মারুফা প্রবাসে থাকার সুবাদে জামাই সৌরভের সঙ্গে শাশুড়ির অবৈধ প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এই অনৈতিক বিষয়টি পুত্রবধূ স্বর্ণা দেখে ফেলায় এবং পরিবারের অন্যদের কাছে প্রকাশ করায় তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

কর্মসূচিতে উপস্থিত স্থানীয় ইউপি সদস্য আলতাফ হোসেন বলেন, "নিহত স্বর্ণার পরিবারটি খুবই অসহায় এবং অত্যন্ত ভদ্র। মেয়েটাও অনেক নম্র ও পর্দানশীন ছিল। এই বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যারা জড়িত, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের কঠোর শাস্তি হওয়া প্রয়োজন।"

এদিকে নিহত স্বর্ণার বাবার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। মেয়ের কবরের পাশে মাটিতে লুটিয়ে কাঁদছেন মা রিনা বেগম। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে অভিযোগ করেন, "আমি ওই বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। স্বর্ণা আমার কোলে মাথা রেখে বলেছিল— ‘মা, এখানে আমার ভালো লাগে না। আমারে ১০ হাজার টাকা দিবা? আমি তোমার জামাইকে নিয়া ঢাকা যামু।’ কারণ জানতে চাইলে ও লজ্জায় বলেছিল, ওর শাশুড়ি আর ননদের জামাইয়ের অবৈধ সম্পর্ক ও দুই-তিন দিন ধরে দেখে ফেলেছে। এই কথাগুলো ঘরের আড়াল থেকে শাশুড়ি মুনজুমা শুনে ফেলে এবং পরের দিন আমাকে জোর করে বাড়ি পাঠিয়ে দেয়। এর কিছুক্ষণ পরেই শুনি আমার মেয়ে নাকি গলায় ফাঁস দিয়েছে! কিন্তু আশপাশের কেউ ওরে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখে নাই। শাশুড়ি-জামাই মিলেই আমার আদরের মেয়েটারে মাইরা ফেলছে।"

নিহত স্বর্ণার পিতা পেশায় কাঠমিস্ত্রি কামাল হাওলাদার আহাজারি করে বলেন, "মানুষের কাছে হাত পেতে চান্দা (চাঁদা) তুলে মেয়েটারে বিয়ে দিছিলাম। কে জানতো ওরা আমার মাইয়াটারে এভাবে মেরে ফেলবে? গরিবের জন্য কি কোনো বিচার নাই? ঘটনার পর শাশুড়ি আর জামাই কীভাবে পালিয়ে গেল? আমি প্রশাসনের কাছে এর সুষ্ঠু বিচার চাই।"

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার (১০ জুন) স্বামীর বাড়ি পশুরীবুনিয়া এলাকা থেকে গুরুতর অবস্থায় স্বর্ণাকে উদ্ধার করে প্রতিবেশীরা পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে পটুয়াখালী সদর থানা পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্ত শাশুড়ি মুনজুমা ও ননদ জামাই সৌরভ পলাতক রয়েছেন। স্বর্ণার শ্বশুর খালেক মিরা (৬০) আগে থেকেই ঢাকায় অবস্থান করছেন বলে জানা গেছে।

অভিযুক্ত শাশুড়ি, ননদ জামাই এবং শ্বশুরের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

পটুয়াখালী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান জানান, "হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের ঘটনায় থানায় একটি নিয়মিত মামলা দায়ের হয়েছে। ইতোমধ্যে নিহতের স্বামীকে আটক করে আদালতে সোপর্দ করা হলে বিজ্ঞ আদালত তাকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। বিষয়টি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। ময়নাতদন্তের রিপোর্ট এলে হত্যার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে এবং পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।"