মন্ত্রিসভায় রদবদলের গুঞ্জন রাজনৈতিক অঙ্গনে এখনও অব্যাহত রয়েছে। তবে মন্ত্রিসভা রদবদলের আলোচনায় ‘আতঙ্কে’ থাকা বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর আপাতত বিপদ কেটে গেছে। কাঙ্ক্ষিত পারফরম্যান্সের ঘাটতি ও নানা বিতর্কের কারণে বাদ পড়ার আলোচনায় থাকা এসব মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবারও মন্ত্রিসভায় বহাল রয়েছেন।

তবে রাজনৈতিক মহলের আলোচনা থামেনি। দ্রুতই আবারও মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আসতে পারে—এমন গুঞ্জন রয়েছে। সরকারের ছয় মাস পূত্রিকে সামনে রেখে বেশ কিছুদিন ধরেই মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের গুঞ্জন চলছিল। কর্মদক্ষতা ও পারফরম্যান্স বিবেচনাধীন রেখে কয়েকজন মন্ত্রী বাদ পড়তে পারেন—এমন আলোচনা ছিল সরকারি ও রাজনৈতিক বিভিন্ন মহলে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, শিক্ষা এবং যোগাযোগ মন্ত্রণালয় নিয়ে আগ্রহ ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে শেষ পর্যন্ত এসব মন্ত্রণালয়ে কোনো পরিবর্তন আসেনি। বরং আলোচনাড় বাইরে থাকা তথ্য মন্ত্রণালয়ে নতুন মুখ যুক্ত হওয়ায় অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী বলেন, ‘মন্ত্রিসভায় এবার বড় ধরনের রদবদল না হলেও বিতর্কিত বা কম সক্রিয় মন্ত্রীদের জন্য এটি ছিল শেষ সুযোগের মতো। আপাতত বিপদ কাটলেও পরবর্তী পুনর্গঠনে কে থাকবেন আর কে বাদ পড়বেন, তা নিয়ে ফের নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।’
সাম্প্রতিক জ্বালানি সংকট ও লোডশেডিং নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া ক্ষোভের কারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে ঘিরে নানা আলোচনা হয়েছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তার কারণে সংকট প্রকট হয়েছে বলে অনেকের মত। অভিজ্ঞতা ও বিকল্প নেতৃত্বের বিষয়টি বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত বর্তমান মন্ত্রীর ওপরই আস্থা রেখেছে সরকার।
এবারের রদবদলে সবচেয়ে বড় চমক এসেছে তথ্য মন্ত্রণালয়ে। মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের আলোচনায় জহির উদ্দিন স্বপনের নাম না থাকলেও, তাকে তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা করা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একজন মন্ত্রী ও একজন প্রতিমন্ত্রীর পাশাপাশি নতুন করে আরও একজন প্রতিমন্ত্রী যুক্ত করা হয়েছে। ফলে একই মন্ত্রণালয়ে একজন মন্ত্রী ও দুজন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করবেন। স্বাধীনতার পর একই মন্ত্রণালয়ে একই পদমর্যাদার দুজন প্রতিমন্ত্রী নিয়োগের ঘটনা বেশ বিরল। এই তিনজনের সমন্বয়ে দেশের বৈশ্বিক ও কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ কতটা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
মন্ত্রিসভায় পরিবর্তনের আলোচনায় উত্তরবঙ্গের দুজন প্রতিমন্ত্রী এবং ঢাকার একজন পূর্ণ মন্ত্রীর দিকেও নজর ছিল। তাদের মধ্যে এক প্রতিমন্ত্রীর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলেও সেটি সরকারের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হয়নি। আরেক প্রতিমন্ত্রী বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের আলোচনায় থাকলেও সম্প্রতি নীরব থাকার কৌশল নিয়েছেন। অন্যদিকে ঢাকার ওই মন্ত্রীও অতিকথন থেকে বিরত রয়েছেন। ফলস্বরূপ, এই তিনজনই আপাতত মন্ত্রিসভায় টিকে গেছেন।

তিনি আরও বলেন, ‘সরকারের ৬ মাস পূর্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বেশ কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীকে নিয়ে গুঞ্জন ছিল। কেউ কেউ ভেবেছিলেন, প্রথম রদবদলেই তারা বাদ পড়তে পারেন। কারণ গত ৬ মাসে মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট কাজ ও মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের সামগ্রিক কর্মকাণ্ডের খতিয়ান প্রধানমন্ত্রীর হাতে রয়েছে।’

অন্যদিকে, শিক্ষাঙ্গনে নানা ঘটনার কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তবে রাজনৈতিক ভারসাম্য ও বিভিন্ন হিসাব-নিকাশের কারণে শেষ পর্যন্ত এ মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তন আনা হয়নি। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের নির্বাচনের আগে বিভিন্ন চাপ ও প্রলোভন সত্ত্বেও ওই মন্ত্রী অবিচল থাকায় রাজনৈতিক বিবেচনাও গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা গেছে।

নতুন তথ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আন্দালিভ রহমান পার্থ। পার্লামেন্টারিয়ান হিসেবে সুনাম অর্জনকারী এই নেতার তরুণ প্রজন্মের মধ্যে জনপ্রিয়তা রয়েছে। এখন এই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তিনি তথ্য মন্ত্রণালয়ের নানা চ্যালেঞ্জ কতটা সফলভাবে মোকাবিলা করতে পারেন, সেটাই দেখার বিষয়। মন্ত্রণালয়ে একজন উপদেষ্টা ও একজন প্রতিমন্ত্রী থাকায় তাকে প্রশাসনিক সমন্বয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও মোকাবিলা করতে হবে।

রাজনৈতিক মহলের ধারণা, বর্তমান পরিস্থিতি স্থায়ী নয়। আগামী দিনে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের কর্মদক্ষতা, রাজনৈতিক প্রয়োজন এবং বিভিন্ন বিতর্ক বিবেচনা করে আবারও মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আসতে পারে। তাই রদবদলের এই গুঞ্জন আপাতত থামছে না।